কুরআন এবং উল্কা

‘উল্কা’ শব্দটির সাথে আমরা অনেকেই পরিচিত, একইভাবে পরিচিত ‘Shooting Star’ নামটির সাথেও। আমরা অনেকেই জানি ‘Shooting Star’ মানে কোনো নক্ষত্রের খসে পড়া বা ছুটে চলা নয়। খুব ছোটবেলায় আমি মনে করতাম এইযে আকাশে আমরা এতো এতো তারা দেখি, এসব তারা আসলে স্থির অবস্থায় আছে, আকাশটাকে সুন্দর সাজিয়ে রেখেছে, ঠিক বিয়ে বাড়ির লাইটের মতন। আর বুঝতাম, ‘Shooting Star’ মানে এসব তারা থেকে কোনো একটি তারার ‘ছুটে চলা’। একটি ছোট বাচ্চার জন্য এসব ধারণা খুব স্বাভাবিক, তবে সবার জন্য নয়।

উল্কা আসলে কি? উল্কা হচ্ছে মহাকাশে থাকা ছোট শিলাময় বা ধাতব বস্তু। [১] উল্কা সমূহ গ্রহাণু থেকে ছোট এবং একটি শস্যকণা থেকে এক মিটার পর্যন্ত প্রশস্ত হয়। [২] এরচেয়ে ছোট বস্তু সমূহ Micrometeoroids বা ‘মহাশূন্যের ধূলিকণা’ হিসেবে বিবেচিত। [২] [৩] [৪]

সাধারণত সেকেন্ড প্রতি ২০ কিলোমিটার পরিমানের বেশি গতিতে কোনো উল্কা, ধূমকেতু বা গ্রহাণু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করলে বায়ুর সাথে সেই বস্তুর সংঘর্ষের ফলে উত্তাপ সৃষ্টি হওয়া আলোর একটি রেখা তৈরি করে। পৃথিবী থেকে এই ঘটনা দেখলে মনে হয় আকাশের কোনো তারা একদিকে ছুটে চলছে। একসময়কার মানুষরা সেটাকেই সত্য বলে বিশ্বাস করতো। বিজ্ঞানের অবদানে আজ আমরা প্রকৃতির অনেককিছুই জানি এবং বুঝি, যা একসময়কার মানুষরা জানতো না, বুঝতো না। কোনো ঘটনার পেছনে থাকা প্রকৃত সত্য না জানলে কোনো অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যা বা নিজেদের অনুমাননির্ভর কোনো ধারণাকেই প্রকৃত সত্য বলে ধরে নিতো।

প্রাচীনকাল বা মধ্যযুগের মানুষদের রাতের আকাশে উল্কা বা গ্রহাণু দেখলে সেটাকে আকাশের তারাই মনে করতে হতো, তাদের বোঝার কোনো উপায় ছিলো না যে ওটাকে দেখে ‘ছুটে চলা তারা’ মনে হলেও ওটা কোনো তারা নয়। প্রাচীনকাল বা মধ্যযুগের একজন সাধারণ মানুষ রাতের আকাশে উল্কা দেখে সেটাকে ‘ছুটে চলা তারা’ মনে করলেও, কোনো সর্বজ্ঞানী ঈশ্বর এই ভুলটা করবেন না। কোনো ধর্মগ্রন্থ পড়ে যদি এমনটা বুঝা যায় যে, সেই ধর্মের ঈশ্বর রাতের আকাশে ছুটে চলা উল্কাকে ছুটে চলা তারা মনে করেন, তাহলে বুঝতে হবে ধর্মগ্রন্থটি কোনো সাধারণ মানুষের লেখা, যার মধ্যে তার সমসাময়িক ভুল বিশ্বাস ছিলো।

আমরা সবাই এবিষয়ে একমত হতে পারি যে, কোনো ধর্মগ্রন্থ যদি আসলেই ঐশ্বরিক হয়, মানবরচিত না হয়, তাহলে সেই ধর্মগ্রন্থ কোনো ভুল তথ্য ধারণ করবে না, কোনো ভুল বিশ্বাস সেই ধর্মগ্রন্থে স্থান পাবে না। মুসলিমরা দাবি করেন, তাদের ধর্মগ্রন্থে বিন্দুমাত্র ভুল নেই, কুরআন নাজিল হওয়ার সমসাময়িক কোনো ভুল বিশ্বাসের লেশমাত্র নেই। তবে দুঃখজনকভাবে এটি মুসলিমদের আরও একটি ভুল বিশ্বাস বা তাদের ধর্মের প্রতি তাদের অন্ধত্ব ছাড়া কিছুই না। কেননা, কুরআনের কিছু আয়াত থেকে খুব পরিষ্কারভাবেই এটি প্রতীয়মান হয় যে, কুরআনের বাণী যার বাণী তিনি রাতের আকাশে ছুটে চলা উল্কাকে ‘ছুটে চলা তারা’ মনে করতেন, যা মধ্যযুগের সাধারণ মানুষদের মধ্যে প্রচলিত একটি ভুল বিশ্বাসকেই তুলে ধরে।

সূরা আল-মুলকের আয়াত ৫ পড়লে আমরা জানতে পারি যে কুরআন দাবি করে, আল্লাহ্ নক্ষত্র সমূহ দ্বারা আকাশকে সাজিয়েছেন এবং সেসব নক্ষত্র সমূহকে শয়তানদের প্রতি নিক্ষেপের বস্তু বানিয়েছেন। আয়াতটি উল্লেখ করা হলো:

67:5
وَ لَقَدۡ  زَیَّنَّا السَّمَآءَ الدُّنۡیَا بِمَصَابِیۡحَ وَ جَعَلۡنٰہَا  رُجُوۡمًا  لِّلشَّیٰطِیۡنِ وَ اَعۡتَدۡنَا لَہُمۡ عَذَابَ السَّعِیۡرِ ﴿۵﴾
English - Sahih International
And We have certainly beautified the nearest heaven with stars and have made [from] them what is thrown at the devils and have prepared for them the punishment of the Blaze.
Bengali - Mujibur Rahman
আমি নিকটবর্তী আকাশকে সুশোভিত করেছি প্রদীপমালা দ্বারা এবং ওগুলিকে করেছি শাইতানের প্রতি নিক্ষেপের উপকরণ এবং তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি।

নিঃসন্দেহেই, ‘প্রদীপ’ শব্দটি দ্বারা এখানে ‘নক্ষত্র’ বা ‘তারা’ বুঝানো হয়েছে। কেননা, তারকারাজি বা নক্ষত্র সমূহই রাতের অন্ধকার আকাশকে সুশোভিত করে বা সাজিয়ে রাখে, যাদেরকে রাতের অন্ধকার আকাশে ছোট ছোট আলোর ফোঁটার মতো দেখায়। রাতের আকাশের তারকারাজি সবসময়ই রাতের আকাশে দেখা যায়, তাদেরকে দেখে মনে হয় তারা স্থির অবস্থায় জ্বলছে। অপরদিকে, উল্কা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করার পর জ্বলে উঠলে সামান্য কিছু মূহুর্তের জন্যই কেবল দৃশ্যমান হয়, তাছাড়া পৃথিবী থেকে উল্কা দেখা যায় না। এটি আমরা সহজেই বুঝতে পারি, যে বস্তু সামান্য কিছু মুহূর্তের জন্য দৃশ্যমান হওয়া ছাড়া রাতের আকাশে দেখাই যায় না, সেই বস্তুকে কুরআনে প্রদীপমালার সাথে তুলনা দেওয়া হয়নি, যে প্রদীপমালা দ্বারা আকাশ সুশোভিত। অতএব, এটি পরিষ্কার যে কুরআন যার বাণী তিনি জানতেন না যে রাতের আকাশে ছুটে চলা তারার মতো দেখতে যা মাঝেমাঝে দেখা যায় তা আসলে তারা নয়, বরং একদমই ভিন্ন ধরনের বস্তু।

কুরআনের এই ভুলটি সহীহ্ মুসলিম হাদিস গ্রন্থের একটি সহীহ্ হাদিসেও এসেছে:

গ্রন্থঃ সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ৪০। সালাম (كتاب السلام)
হাদিস নম্বরঃ ৫৭১২
৩৫. জ্যোতির্বিদ্যা ও জ্যোতিষীর কাছে গমনাগমন নিষিদ্ধ
৫৭১২-(১২৪/২২২৯) হাসান ইবনু ‘আলী আল হুলওয়ানী (রহঃ) ও আবদ ইবনু হুমায়দ (রহঃ) …… আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহাবীগণের মধ্যে আনসারদের জনৈক ব্যক্তি আমাকে সংবাদ দিয়েছে যে, তারা এক রাত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে বসা ছিলেন। সে সময় একটি নক্ষত্র পতিত হলো, যার দরুন আলোকিত হয়ে উঠল। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন, এ ধরনের (তারকা) পতিত হলে অজ্ঞতার যুগে তোমরা কি বলতে? তারা বলল, আল্লাহ এবং তার রসূলই অধিক ভাল জানেন। আমরা বলতাম, আজ রাতে মনে হয় কোন মহান লোকের ভূমিষ্ঠ হয়েছে অথবা কোন মহান লোক মৃত্যুবরণ করেছেন।
তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ জেনে রাখো যে, তা কারো মৃত্যু কিংবা কারো জন্মের কারণে পতিত হয় না; কল্যাণময় ও মহান নামের অধিকারী আমাদের প্রতিপালক যখন কোন বিষয়ের সমাধান দেন, তখন আরশ বহনকারী ফেরেশতারা তাসবীহ পাঠ করে। অতঃপর তাসবীহ পাঠ করে সে আকাশের ফেরেশতারা, যারা তাদের পার্শ্ববর্তী পরিশষে তাসবীহ পাঠ এ নিকটবর্তী (পৃথিবীর) আসমানের অধিবাসীদের পর্যন্ত পৌছে।
অতঃপর আরশ বহনকারীদের (ফেরেশতা) পার্শ্ববর্তী যারা তারা আরশ বহনকারীদের বলে তোমাদের প্রতিপালক কি বললেন? সে সময় তিনি তাদের যা কিছু বলেছেন, তারা সে সংবাদ বর্ণনা করে। বর্ণনাকারী বলেন, পরে আসমানসমূহের অধিবাসীরা একে অপরকে সংবাদ আদান-প্রদান করে। পরিশেষে এ নিকটবর্তী আকাশে সংবাদ পৌছে। সে সময় জিনেরা অতর্কিতে গোপন খবরটি শুনে নেয় এবং তাদের দোসর জ্যোতিষীদের নিকট পৌছিয়ে দেয়, আর সাথে অতিরিক্ত কিছু জুড়ে দেয়। ফলে যা তারা ঠিকঠাকভাবে নিয়ে আসতে পারে, তাই ঠিক হয়; তবে তারা তাতে (কথামালা) সুবিন্যস্ত ও সংযোজন করে। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৫৬২৫, ইসলামিক সেন্টার  ৫৬৫৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

তথ্যসূত্রঃ

  1. meteoroid Meaning in the Cambridge English Dictionary”. dictionary.cambridge.org.
  2. a b c Rubin, Alan E.; Grossman, Jeffrey N. (January 2010). “Meteorite and meteoroid: New comprehensive definitions”. Meteoritics & Planetary Science45 (1): 114–122. Bibcode:2010M&PS…45..114R. doi:10.1111/j.1945-5100.2009.01009.x.)
  3. Atkinson, Nancy (2 June 2015). “What is the difference between asteroids and meteorites?”. Universe Today.
  4. “meteoroids”. The Free Dictionary. Retrieved 1 August 2015.

Marufur Rahman Khan

Marufur Rahman Khan is a Bangladeshi Atheist, Feminist, Secularist Blogger.

2 thoughts on “কুরআন এবং উল্কা

  • December 6, 2019 at 11:54 AM
    Permalink

    hi, nice to talk to you, u r giving metaphore as scientific explanation, I think u still believe in islam, that’s why u r writing against it, to feel you hate it,
    if u know islam is wrong why wasting time on it? I just asked simply. curious to know you.
    u r feminist, I don’t like these types of ppl. truly to say. cz if anything happens between a grl and a boy a feminist force to prove that the boy is wrong. grl are soft, they don’t do hard job. although he is a boy. I just thought about you. don’t mind on it.
    and if you find a religion based on science, how many ppl will make it, u think, are ppl around einstein or newton. even newtons theory are proved wrong after 1000 yrs by einstein theory. then how long a religion will hold based on science. I don’t know. our knowledge about science always change or upgrade or degrade.
    whatever I just thought about it. nothing else I think to fight with.

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *